৮৯ কোটি টাকার শ্রমিক সুরক্ষা প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন, জিআইজেডের সঙ্গে অনুদান চুক্তির মেয়াদও শেষ

একনেকের অনুমোদন তো দূরের কথা, সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ওঠার আগেই শ্রমিক সুরক্ষায় নেওয়া একটি প্রকল্পের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অথচ প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হতে বাকি মাত্র কয়েক মাস। এর মধ্যে উন্নয়ন সহযোগী জার্মানির জিআইজেডের সঙ্গে অনুদান চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া ‘দ্য ইমপ্রুভড ওয়ার্কিং কন্ডিশন অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ফর ওয়ার্কার্স ইন দ্য টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার সেক্টর’ শীর্ষক প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের তৃতীয় এবং বর্তমান সরকারের অষ্টম একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফলে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগে এসে এটি আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের জন্য একনেকে উঠছে।

অনুমোদনের আগেই বাস্তবায়ন

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, একনেক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর প্রকল্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম শুরু করার কথা। কিন্তু এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাস্তবে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

ডিআইএফইর এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এখনো না হলেও এরই মধ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন স্টাডি, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি এবং প্রায় সাড়ে ৮ লাখ শ্রমিকের তথ্য নিয়ে ডাটাবেজ তৈরির কাজ রয়েছে।

ডিআইএফইর অর্থ ও পরিকল্পনা অধিশাখার যুগ্ম মহাপরিদর্শক মো. হাসিবুজ্জামান বলেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অনুমোদন নিয়ে প্রকল্পটির কিছু বাস্তব কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি অনুদান চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়াও ইআরডিতে চলমান রয়েছে।

চুক্তির মেয়াদও শেষ

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার ও জিআইজেডের মধ্যে ৭ মিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার অনুদান নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। চুক্তিটির মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এরপর ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভায় প্রকল্পটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এসপিইসি সভার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সংশোধিত টিএপিপি দ্রুত জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা জমা পড়ে প্রায় ১৪ মাস পর, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

ততদিনে উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে মূল অনুদান চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। বিষয়টি উল্লেখ করে চলতি বছরের ৯ মার্চ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ। চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও হালনাগাদ তথ্য চাওয়া হলেও এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক জবাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রশাসনিক বিলম্ব নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য

প্রকল্পের টিএপিপি পুনর্গঠনে দীর্ঘ বিলম্বের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, জিআইজেডের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া, পরিকল্পনা কমিশনের আর্থিক পর্যবেক্ষণ এবং নথিপত্র সংশোধনের কারণে সময় লেগেছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণেও কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে ডিআইএফইর কর্মকর্তা মো. হাসিবুজ্জামান দাবি করেন, টিএপিপি পুনর্গঠনে মন্ত্রণালয়ের গাফিলতি ছিল না। জিআইজেডের নিজস্ব দাপ্তরিক প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প প্রস্তাব বারবার সংশোধনের কারণেই সময় লেগেছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখার উপসচিব মো. আমজাদ হোসেনও জানান, এসপিইসি সভার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংশোধনী তৈরি ও টিএপিপি পুনর্গঠনে কিছুটা বেশি সময় লেগেছে। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না থাকলেও মাঠপর্যায়ে প্রকল্পটির কিছু কার্যক্রম চলছে।

শ্রমিকদের জন্য কী আছে

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির আওতায় দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত শ্রমিকদের পুনর্বাসন, কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপনসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। একটি ডিজিটাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ শ্রমিকের তথ্য ডাটাবেজে যুক্ত করার কাজও হয়েছে।

এ ছাড়া বেকার হয়ে পড়া শ্রমিকদের জন্য তিন মাস মেয়াদে মাসিক ১৫ হাজার টাকা সহায়তার প্রোটোকল তৈরির কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পটির আওতায় ৯২টি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বায়ার অর্থায়ন করছে বলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন

প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণে পরামর্শক ফি, সফটওয়্যার, বিদেশ সফর এবং সভা-সেমিনারের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য—শ্রমিকদের নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, দুর্ঘটনাজনিত সহায়তা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়ন—এর সঙ্গে ব্যয়ের কাঠামোর সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, অনুমোদনের আগে প্রকল্পের বড় অংশ বাস্তবায়ন হয়ে থাকলে সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশীদ বলেন, একনেকে অনুমোদনের আগে প্রকল্পের কাজ শুরু করার নিয়ম নেই। অনুদানভিত্তিক প্রকল্প হলেও অনুমোদন ছাড়া কাজ শুরু করা বিধিসম্মত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তার মতে, অনুমোদনের আগে কাজ হয়ে থাকলে একনেকের অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট কাজগুলো বাস্তবে হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কারিগরি প্রকল্পের ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে কাজ দেখানো হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত।

এদিকে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ। এখন প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এবং ইতোমধ্যে সম্পন্ন কাজের আইনগত ও প্রশাসনিক ভিত্তি নিয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই দেখার বিষয়।